গাড়ির সিগনাল লাইট সিস্টেম ও ওয়াইপার ব্লেড লিভার ব্যবহারের নিয়ম

ড্রাইভিং শেখার সময় আমরা অনেকেই স্টিয়ারিংয়ের দুপাশে থাকা ২ টি লম্বা সুইচ বা লিভার দেখতে পাই। আর এ লিভার বা সুইচ দুটি নিয়ে কনফিউজড হয়ে যাই। বিশেষ করে আমরা যারা নতুন তারা এই সুইচ গুলো ব্যবহারের বিষয়ে অনেক আগ্রহী হয়ে থাকি। আমি আপনাদের এই পোস্টে দেখাবো এই লিভার বা সুইচ দুটির কাজ কী এবং কীভাবে এগুলো ব্যবহার করবেন। চলুন শুরু করা যাক!"

পোস্টের নিচের ছবিতে থাকা ডান পাশের সুইচটি সাধারণত পার্কিং লাইট, হেডলাইট এবং বিভিন্ন সিগন্যালের জন্য ব্যবহৃত হয়।

গাড়ির সিগনাল লাইট সিস্টেম
গাড়ির সিগনাল লাইট সিস্টেম

গাড়ির ইন্ডিকেটর লাইট ব্যবহারের নিয়ম

Turn Indicator Light Left (বামে মোড় নিতে): লিভারটি আলতো করে উপরের দিকে উঠিয়ে নিন। এরপর দেখুন বাম পাশের ইন্ডিকেটর জ্বলে উঠবে। এরপর গাড়ি বামে মোড় ঘুরে গেলে স্টিয়ারিং সোজা করলে ইন্ডিকেটর সুইচ অটোমেটিক বন্ধ হয়ে যাবে।

আরও পড়ুনঃ অটো গিয়ার গাড়ি চালানোর নিয়ম

আপনার গাড়িতে যদি অটোমেটিক ইন্ডিকেটর সুইচ বন্ধ না হয় তাহলে ইন্ডিকেটর সুইচ বন্ধ করার জন্য নিচের দিকে এক স্টেপ ডাউন করুন। দেখবেন যে ইন্ডিকেটর লাইটি বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

Turn Indicator Light Right (ডানে মোড় নিতে): লিভারটি নিচের দিকে ডাউন করুন বা নামিয়ে নিন। এরপর দেখুন ডান পাশের ইন্ডিকেটর জ্বলে উঠবে। এরপর অনুরূপভাবে গাড়ি ডানে মোড় ঘুরে গেলে স্টিয়ারিং সোজা করলে ইন্ডিকেটর সুইচ অটোমেটিক বন্ধ হয়ে যাবে।

এখন আপনার গাড়িতে যদি অটোমেটিক ভাবে ইন্ডিকেটর সুইচ বন্ধ না হয় তাহলে ইন্ডিকেটর সুইচ বন্ধ করার জন্য উপড়ের দিকে এক স্টেপ আপ করুন। দেখবেন যে ইন্ডিকেটর লাইটি বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

পার্কিং লাইট, ফগ লাইট, হেডলাইট ব্যবহারের নিয়ম

গাড়িতে পার্কিং লাইট, ফগ লাইট, হেডলাইট (Head light) জ্বালানোর জন্য লিভার বা সিগন্যাল লাইট কন্ট্রোল সুইচের মাথার অংশটি সামনের দিকে ঘুরিয়ে পার্কিং নিন। এরপর সুইচটির মাধ্যমে যে সকল লাইট জ্বালাতে পারবেন নিচে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হলো।

OFF: লাইট বন্ধ। বড় ফুলস্টপ এর মত চিহ্ন এর সোজাসুজি সুইচের অফ (OFF) লেখা থাকলে বুঝবেন লিভার বা সুইচটি বন্ধ আছে এ অবস্থায় কোন লাইট জ্বলবে না।

Turn the switch up (প্রথম ক্লিক উপরের দিকে): পার্কিং লাইট বা ছোট লাইট জ্বলবে। অর্থাৎ সামনের দিকে দুইটি এবং পিছনের দিকে ডানে ও বামে দুইটি মোট চারটি ছোট লাইট জ্বলবে। এই পার্কিং লাইট বন্ধ করতে চাইলে আবার এক স্টেপ পিছনের দিকে ঘুরিয়ে নিন।

গাড়ির পার্কিং লাইট কখন ব্যবহার করবেন? 

  • সন্ধ্যা/ভোরে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখলে
  • হালকা আলোতে, যখন হেডলাইট দরকার নেই
  • পার্কিং অবস্থায় অন্য গাড়িকে জানানোর জন্য

Turn the switch up (দ্বিতীয় ক্লিক উপরের দিকে): মেইন হেডলাইট জ্বলবে। অর্থাৎ সামনের দিকে দুইটি বড় হেডলাইট (Head Light) জ্বলবে। আপনি যখন গাড়িতে হেডলাইট জ্বালিয়ে রাখবেন, সাথে পার্কিং লাইট বা ছোট লাইটও জ্বলে থাকবে। সামনের হেডলাইট (Low Beam) জ্বলে।

কোন সময় গাড়িতে হেড লাইট জ্বালাবেন ?

  • রাতে গাড়ি চালানোর সময়
  • অন্ধকার রাস্তা
  • বৃষ্টি বা কুয়াশার সময়

হেড লাইট ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ টিপস

  • দিনে হেডলাইট অন করে রাখা দরকার নেই (যদি DRL না থাকে)।
  • শহরে রাতে Low Beam ব্যবহার করবেন।
  • High Beam শুধু ফাঁকা রাস্তায় ব্যবহার করবেন।

গাড়ির ফগ লাইট ব্যবহার করার সঠিক নিয়ম

Fog Light (ফগ লাইট): ফগ লাইট সাধারণত লাইট সুইচের মাঝখানের রিং (Ring Switch) উপড়ের দিকে ঘুরিয়েই অন/ অফ করা যায়।

আমার এই মডেল গাড়িতে এক স্টেপ ঘোরালে → ফ্রন্ট ফগ লাইট অন হয়। কিছু গাড়িতে সিস্টেম আছে আরেক স্টেপ উপরের দিকে ঘুরালে → রিয়ার ফগ লাইট অন হয়। অনেক গাড়িতে নিয়ম এমন আছে আগে পার্কিং লাইট বা হেডলাইট অন থাকতে হবে তারপর রিং ঘোরালে ফগ লাইট জ্বলবে (লাইট বন্ধ থাকলে ফগ লাইট কাজ করে না)।

কখন গাড়ির ফগ লাইট ব্যবহার করবেন?

কুয়াশা, ভারী বৃষ্টি,ধুলা-বালি বা কম ভিজিবিলিটিতে পরিষ্কার রাস্তায় অযথা ফগ লাইট ব্যবহার করা ঠিক না এতে সামনের গাড়ির চোখে সমস্যা হতে পারে।

গাড়ির আপার–ডিপার (High / Low Beam) লাইটের সঠিক ব্যবহার

গাড়ি চালানোর সময় সঠিকভাবে আপার ও ডিপার লাইট ব্যবহার করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ—এতে নিজের যেমন সুবিধা হয়, তেমনি অন্য চালকরাও নিরাপদ থাকে।

  • হেডলাইট অন করলে = লো বিমে লাইট জ্বলবে।
  • লিভার নিচের দিকে ডাউন করলে = হাই বিমে 
  • লিভার টানা উপরের দিকে = ফ্ল্যাশ / ডিপার

লিভারটি নিজের দিকে টানলে ডিপার, পাস লাইট বা ফ্ল্যাশ লাইট জ্বলবে। আর সামনের দিকে ঠেলে দিলে 'হাই বিম' (High Beam) স্থায়ীভাবে জ্বলবে।

ডিপার লাইট (Low Beam) কখন ব্যবহার করবেন

  • সন্ধ্যা, রাত ও ভোরে স্বাভাবিক ড্রাইভিংয়ের সময়
  • শহরের রাস্তায় যেখানে স্ট্রিট লাইট থাকে
  • সামনে বা বিপরীত দিক থেকে গাড়ি আসলে
  • বৃষ্টি, কুয়াশা বা ধুলাবালির সময়

কারণ: ডিপার লাইট রাস্তা পরিষ্কারভাবে দেখায় কিন্তু সামনে থাকা চালকের চোখে ঝলক দেয় না।

আপার লাইট (High Beam) কখন ব্যবহার করবেন

  • অন্ধকার হাইওয়ে বা গ্রামীণ রাস্তায়
  • যখন সামনে বা বিপরীত দিকে কোনো গাড়ি নেই
  • রাস্তার পাশে মানুষ/পশু থাকার সম্ভাবনা থাকলে

কারণ: আপার লাইট দূরের রাস্তা স্পষ্ট দেখায়।

গাড়ির আপার লাইট কখন ব্যবহার করা যাবে না

  • সামনে গাড়ি থাকলে
  • বিপরীত দিক থেকে গাড়ি এলে
  • শহরের ব্যস্ত রাস্তায়
  • এতে অন্য চালকের চোখে তীব্র আলো পড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।

টিপস: ভালো অভ্যাস গড়ে তুলুন সামনে গাড়ি দেখলেই সঙ্গে সঙ্গে ডিপার করুন। আপার–ডিপার ব্যবহার করে প্রয়োজনে সংকেত (Signal) দিন।

আরও পড়ুনঃ গাড়ির ড্যাশবোর্ড মিটার পরিচিতি

ওয়াইপার ব্লেড লিভার ব্যবহারের নিয়ম
গাড়ির সিগনাল লাইট সিস্টেম

গাড়ির ওয়াইপার ব্লেড লিভার ব্যবহারের নিয়ম

গাড়ির ওয়াইপার (Wiper) বৃষ্টির দিনে বা ধুলোবালির মধ্যে গাড়ি চালানোর জন্য সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। এটি শুধু কাঁচ পরিষ্কার রাখে না, বরং আপনার নিরাপদ ড্রাইভিং নিশ্চিত করে।

গাড়ির Wiper (ওয়াইপার) এর সাহায্যে সামনে ও পিছনের গ্লাস বা উইন্ডশিল্ড সহজে পরিষ্কার করা যায়। তাই ওয়াইপার ব্লেড ব্যবহার করার সঠিক নিয়ম সকল চালকের জানা থাকা দরকার।

সঠিকভাবে ওয়াইপার ব্যবহার না করলে, Wiper দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। সেই সাথে Windshield (উইন্ডশিল্ড) Glass এর ওপরে স্কেচ বা দাগ পড়ে যায়। 

 ওয়াইপার স্পিড সেট করার নিয়ম

ওয়াইপার লিভারে সাধারণত কয়েকটি মোড থাকে। বৃষ্টির তীব্রতা অনুযায়ী সেগুলো ব্যবহার করুন। সঠিক গতির (Speed) ব্যবহার:

  • OFF: ওয়াইপার বন্ধ।
  • Mist/Single Wipe: সামান্য পানির ছিটা পড়লে একবার মোছার জন্য।
  • INT (Intermittent): হালকা বৃষ্টির জন্য। এটি কয়েক সেকেন্ড পরপর একবার করে গ্লাস পরিষ্কার করবে।
  • LO: মাঝারি বৃষ্টির জন্য ওয়াইপার অনবরত চলতে থাকবে।
  • HI: খুব জোরে বৃষ্টির সময় দ্রুত গ্লাস পরিষ্কার করার জন্য।

ওয়াইপারের সাহায্যে পানি স্প্রে করা (PULL WASH):

গ্লাসে ধুলোবালি জমলে বা ঘোলা হলে লিভারটি নিজের দিকে টেনে ধরে রাখুন। এতে গ্লাসে পানি স্প্রে হবে এবং ওয়াইপার নিজে থেকেই কয়েকবার গ্লাসটি মুছে দিবে। ওয়াইপার সম্পর্কে আপনার যা জানা প্রয়োজন:

গাড়ির ওয়াইপার পরিবর্তনের সময়

সাধারণত ওয়াইপার ব্লেড প্রতি ৬ থেকে ১২ মাস অন্তর পরিবর্তন করা উচিত। তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখলে দেরি না করে বদলে ফেলুন:

আরও পড়ুনঃ গাড়ি রেডিয়েটরের কাজ ও রক্ষণাবেক্ষণের নিয়ম

দাগ পড়া (Streaking): কাঁচ মোছার পর যদি স্বচ্ছ না হয়ে ঝাপসা দাগ থেকে যায়।

শব্দ হওয়া (Squeaking): চালানোর সময় যদি কর্কশ শব্দ করে।

অমসৃণ পরিষ্কার: কাঁচের কিছু অংশ পরিষ্কার হচ্ছে আর কিছু অংশ হচ্ছে না।

রাবার ফেটে যাওয়া: ওয়াইপারের রাবার যদি শক্ত হয়ে যায় বা ফেটে ঝুলে থাকে।

ওয়াইপার ব্লেডের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ টিপস

শুকনো কাঁচে চালাবেন না: শুকনো কাঁচে ওয়াইপার চালালে ব্লেড দ্রুত নষ্ট হয় এবং উইন্ডশিল্ডে স্ক্র্যাচ পড়ে। সবসময় ওয়াইপার ফ্লুইড বা পানি স্প্রে করে ব্যবহার করুন।

ওয়াইপার ফ্লুইড ব্যবহার: সাধারণ পানির বদলে ভালো মানের ওয়াইপার ফ্লুইড ব্যবহার করলে কাঁচ বেশি পরিষ্কার হয় এবং রাবার ভালো থাকে।

রোদে পার্কিং: কড়া রোদে গাড়ি পার্ক করলে ওয়াইপারগুলো কাঁচ থেকে একটু উঁচু করে রাখতে পারেন, যাতে তাপের কারণে রাবার গলে কাঁচে আটকে না যায়।

ব্লেড পরিষ্কার রাখুন: মাঝে মাঝে ভেজা কাপড় দিয়ে ওয়াইপারের রাবারটি মুছে নিন, এতে জমে থাকা ধুলোবালি পরিষ্কার হয়ে যাবে।

গাড়ির ওয়াইপারের প্রকারভেদ কি ?

বাজারে মূলত তিন ধরনের ওয়াইপার পাওয়া যায়। নিচে ওয়াইফের ধরন সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:

Conventional (Frame-style): এটি সাধারণ মেটাল ফ্রেমের ওয়াইপার, যা বেশিরভাগ গাড়িতে থাকে।

Beam Blades: এতে কোনো মেটাল ফ্রেম থাকে না, তাই এটি কাঁচের সাথে খুব ভালোভাবে লেগে থাকে এবং দ্রুত পরিষ্কার করে।

Hybrid Blades: এটি ফ্রেম এবং বিম ব্লেডের সংমিশ্রণ, যা দেখতে আধুনিক এবং অনেকদিন টেকে।

শেষ কথাঃ সবসময় মনে রাখবেন, মোড় নেওয়ার অন্তত ১০০ ফুট আগে সিগন্যাল ব্যবহার করা নিরাপদ ড্রাইভিংয়ের অংশ। সঠিক নিয়মে গাড়িতে ওয়াইপার ব্যবহার করবেন তাহলে দীর্ঘদিন ওয়াইপার ভালো থাকবে। আপনি সুস্থ এবং নিরাপদ ভাবে ড্রাইভিং করতে পারবেন। পোস্টটি ভালো লাগলে আপনার মূল্যবান মন্তব্য কমেন্টস করে জানাতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ!"


পূর্বের পোস্ট পরবর্তী পোস্ট
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি
আপনার মতামত দিন
comment url