গাড়ির ইঞ্জিন পরিচিতি: ইঞ্জিনের বিভিন্ন অংশের নাম ও কাজ

গাড়ির ইঞ্জিন পরিচিতি: ইঞ্জিনের বিভিন্ন অংশের নাম ও কাজ
গাড়ির ইঞ্জিন পরিচিতি

গাড়ির ইঞ্জিন কী ?

​গাড়ির ইঞ্জিন হলো এমন একটি যন্ত্র যা জ্বালানি (যেমন: অকটেন, পেট্রোল বা ডিজেল) পুড়িয়ে তাপশক্তি উৎপন্ন করে এবং সেই তাপশক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে চাকা ঘোরানোর কাজ করে। একে মূলত Internal Combustion (IC) Engine বলা হয়।

​গাড়ির ইঞ্জিনের প্রকারভেদ

​গাড়ির ইঞ্জিনকে জ্বালানি, সিলিন্ডার বিন্যাস এবং স্টক অনুযায়ী বিভিন্নভাবে ভাগ করা যায়, তবে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়:

জ্বালানির ভিত্তিতে: পেট্রোল ইঞ্জিন, ডিজেল ইঞ্জিন, সিএনজি/এলপিজি ইঞ্জিন এবং ইলেকট্রিক মোটর।

​সিলিন্ডার বিন্যাস অনুযায়ী: ইন-লাইন (Inline), ভি-ইঞ্জিন (V-Engine), এবং বক্সার ইঞ্জিন।

​স্ট্রোক অনুযায়ী: টু-স্ট্রোক এবং ফোর-স্ট্রোক ইঞ্জিন (বর্তমানে বেশিরভাগ গাড়ি ফোর-স্ট্রোক)।

আরো পড়ুনঃ গাড়ি রেডিয়েটরের কাজ ও রক্ষণাবেক্ষণের নিয়ম

গাড়ির ইঞ্জিনের ১৫টি যন্ত্রাংশ ও কাজ
ইঞ্জিনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পরিচিতি

গাড়ির ইঞ্জিনের ১৫টি যন্ত্রাংশ ও কাজ

১. পিস্টন (Piston): এটি ইঞ্জিনের সিলিন্ডারের ভেতরে ওঠানামা করে। জ্বালানি দহনের ফলে যে চাপ তৈরি হয়, পিস্টন সেই শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তর করে নিচে পাঠিয়ে দেয়।

২. সিলিন্ডার হেড (Cylinder Head): ইঞ্জিন ব্লকের উপরের অংশকে সিলিন্ডার হেড বলে। এর ভেতরেই দহন কক্ষ (Combustion Chamber), ভালভ এবং স্পার্ক প্লাগ অবস্থান করে।

৩. ক্র্যাঙ্কশ্যাফট (Crankshaft): পিস্টনের সোজা (Up-down) গতিকে ঘূর্ণন গতিতে রূপান্তর করা এর প্রধান কাজ। এই ঘূর্ণন শক্তিই শেষ পর্যন্ত গাড়ির চাকাকে ঘুরায়।

৪. ক্যামশ্যাফট (Camshaft): ইনটেক এবং এক্সজস্ট ভালভগুলো কখন খুলবে এবং কখন বন্ধ হবে, তা নিয়ন্ত্রণ করাই ক্যামশ্যাফটের কাজ।

৫. স্পার্ক প্লাগ (Spark Plug): পেট্রোল ইঞ্জিনে এটি অত্যন্ত জরুরি। এটি দহন কক্ষের ভেতরে আগুনের স্ফুলিঙ্গ তৈরি করে বাতাস ও জ্বালানির মিশ্রণে বিস্ফোরণ ঘটায়।

​৬. কানেক্টিং রড (Connecting Rod): এটি পিস্টন এবং ক্র্যাঙ্কশ্যাফটকে যুক্ত করে। পিস্টন থেকে আসা শক্তি এটি ক্র্যাঙ্কশ্যাফটে পৌঁছে দেয়।

৭. ইনটেক ও এক্সজস্ট ভালভ (Valves): ইনটেক ভালভ দিয়ে বাতাস ও জ্বালানি ইঞ্জিনে প্রবেশ করে এবং এক্সজস্ট ভালভ দিয়ে পোড়া ধোঁয়া সিলিন্ডার থেকে বের হয়ে যায়।

আরো পড়ুনঃ গাড়ির হ্যাজার্ড লাইট বা ডাবল ইন্ডিকেটর ব্যবহারের সঠিক নিয়ম

​৮. ফুয়েল ইনজেক্টর (Fuel Injector): এটি নিখুঁতভাবে সিলিন্ডারের ভেতরে জ্বালানি স্প্রে করে। আধুনিক গাড়িতে কার্বুরেটরের বদলে এটি ব্যবহৃত হয়।

​৯. টাইমিং বেল্ট/চেইন (Timing Belt/Chain): এটি ক্র্যাঙ্কশ্যাফট এবং ক্যামশ্যাফটের ঘূর্ণনের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখে, যাতে ভালভ এবং পিস্টন একে অপরের সাথে সংঘর্ষ না ঘটে।

১০. রেডিয়েটর (Radiator): ইঞ্জিনের চারপাশ দিয়ে ঘুরে আসা গরম পানি বা কুল্যান্টকে ঠান্ডা করা এর কাজ। এটি ইঞ্জিনকে অতিরিক্ত গরম হওয়া থেকে রক্ষা করে।

১১. অল্টারনেটর (Alternator): ইঞ্জিন যখন চলে, তখন অল্টারনেটর বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে গাড়ির ব্যাটারি চার্জ রাখে এবং ইলেকট্রনিক সিস্টেম সচল রাখে।

​১২. অয়েল পাম্প (Oil Pump): ইঞ্জিনের ভেতরে মুভিং পার্টসগুলোতে লুব্রিকেন্ট বা মোবিল পৌঁছে দেওয়া এর কাজ, যাতে ঘর্ষণে যন্ত্রাংশ ক্ষয় না হয়।

১৩. টার্বোচার্জার (Turbocharger): এটি ইঞ্জিনে অতিরিক্ত বাতাস পাঠিয়ে কম জ্বালানিতে বেশি শক্তি উৎপন্ন করতে সাহায্য করে।

​১৪. থ্রোটল বডি (Throttle Body): ড্রাইভার যখন এক্সিলারেটর চাপেন, তখন এই থ্রোটল বডি নিয়ন্ত্রন করে ইঞ্জিনে কতটা বাতাস প্রবেশ করবে।

​১৫. ফ্লাইহুইল (Flywheel): এটি ক্র্যাঙ্কশ্যাফটের এক মাথায় থাকে। ইঞ্জিনের ঘূর্ণন গতিকে স্থিতিশীল রাখা এবং গিয়ার বক্সের মাধ্যমে চাকায় শক্তি পাঠাতে এটি সাহায্য করে।

গাড়ির ইঞ্জিনের সঠিক যত্ন ও রক্ষণাবেক্ষণ
গাড়ির ইঞ্জিনের সঠিক যত্ন ও রক্ষণাবেক্ষণ

গাড়ির ইঞ্জিনের সঠিক যত্ন ও রক্ষণাবেক্ষণ

গাড়ির ইঞ্জিনের আয়ু বাড়াতে এবং পারফরম্যান্স ঠিক রাখতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। একটি ইঞ্জিন তখনই দীর্ঘস্থায়ী হয় যখন এর প্রতিটি অংশ সঠিকভাবে কাজ করে। নিচে ইঞ্জিনের যত্নে করণীয় প্রধান দিকগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

লুব্রিকেন্ট বা ইঞ্জিন অয়েল পরিবর্তন

ইঞ্জিনের ভেতরের যন্ত্রাংশগুলোর ঘর্ষণ কমাতে ইঞ্জিন অয়েল বা মোবিল কাজ করে।

করণীয়: গাড়ির ম্যানুয়াল অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিলোমিটার (সাধারণত ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ কিমি) পর পর অয়েল ফিল্টারসহ ইঞ্জিন অয়েল পরিবর্তন করুন।

সতর্কতা: মোবিলের রঙ কালো হয়ে গেলে বা এর আঠালো ভাব কমে গেলে দ্রুত পরিবর্তন করা উচিত।

আরো পড়ুনঃ অটো গিয়ার গাড়ি চালানোর নিয়ম

কুলিং সিস্টেম সচল রাখা

ইঞ্জিন চলার সময় প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়। এই তাপ নিয়ন্ত্রণ না করলে ইঞ্জিন 'সিজ' করতে পারে।

করণীয়: নিয়মিত রেডিয়েটরের পানির স্তর বা কুল্যান্ট চেক করুন। কোনো লিকেজ আছে কি না তা লক্ষ্য রাখুন।

পরামর্শ: দীর্ঘ ভ্রমণে বের হওয়ার আগে কুল্যান্ট রিজার্ভার পূর্ণ আছে কি না নিশ্চিত হোন।

এয়ার ফিল্টার পরিষ্কার ও পরিবর্তন

ইঞ্জিনকে জ্বালানি পোড়ানোর জন্য বিশুদ্ধ বাতাস নিতে হয়। এয়ার ফিল্টার বাতাস থেকে ধুলোবালি সরিয়ে দেয়।

করণীয়: প্রতি মাসে একবার এয়ার ফিল্টার খুলে ঝেড়ে পরিষ্কার করুন। অতিরিক্ত ময়লা হলে বা ফিল্টারটি কালো হয়ে গেলে নতুন একটি ফিল্টার লাগান।

স্পার্ক প্লাগ ও ওয়্যারিং চেক

ইঞ্জিনের ভেতরে দহন প্রক্রিয়া শুরু করে স্পার্ক প্লাগ। এটি দুর্বল হলে গাড়ি স্টার্ট নিতে সমস্যা করে এবং তেলের খরচ বেড়ে যায়।

করণীয়: প্রতি ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ কিমি পর পর স্পার্ক প্লাগ চেক করুন এবং প্রয়োজন হলে বদলে ফেলুন। ইঞ্জিনের ইলেকট্রিক তারগুলো যেন ইঁদুরে না কাটে বা তাপে গলে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখুন।

ড্রাইভ বেল্ট বা টাইমিং বেল্ট পরীক্ষা

ইঞ্জিনের সাথে অল্টারনেটর, এসি কম্প্রেসর এবং পানির পাম্পকে যুক্ত রাখে বিভিন্ন বেল্ট।

করণীয়: বেল্টে কোনো ফাটল আছে কি না বা ঢিলা হয়ে গেছে কি না তা নিয়মিত পরীক্ষা করুন। টাইমিং বেল্ট ছিঁড়ে গেলে ইঞ্জিনের বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে, তাই নির্দিষ্ট সময় পর এটি পরিবর্তন করা জরুরি।

ফুয়েল ফিল্টার ও ইনজেক্টর পরিষ্কার

জ্বালানিতে অনেক সময় সূক্ষ্ম ময়লা থাকে যা ইঞ্জিনের ইনজেক্টরকে বন্ধ করে দিতে পারে।

করণীয়: ভালো মানের ফুয়েল পাম্প থেকে তেল নেওয়ার চেষ্টা করুন। প্রতি বছর অন্তত একবার ফুয়েল ইনজেক্টর পরিষ্কার বা 'সার্ভিসিং' করান।

ড্যাশবোর্ড ওয়ার্নিং লাইটের দিকে নজর রাখা

আধুনিক গাড়িতে ইঞ্জিনে কোনো সমস্যা হলে ড্যাশবোর্ডে 'Check Engine' বা 'Oil Pressure' লাইট জ্বলে ওঠে।

করণীয়: ড্যাশবোর্ডে কোনো সতর্কবার্তা দেখা দিলে দেরি না করে অভিজ্ঞ মেকানিকের মাধ্যমে স্ক্যানিং করিয়ে সমস্যা সমাধান করুন।

আরো পড়ুনঃ গাড়ির ড্যাশবোর্ড মিটার পরিচিতি

ইঞ্জিন বে পরিষ্কার রাখা

ইঞ্জিনের বাইরের অংশে অনেক সময় ধুলোবালি ও তেলের আস্তরণ পড়ে। এতে ইঞ্জিন দ্রুত গরম হয়ে যায়।

করণীয়: ইঞ্জিন ঠান্ডা থাকা অবস্থায় মাঝেমধ্যে পরিষ্কার শুকনো কাপড় দিয়ে মুছুন। তবে সরাসরি হাই-প্রেশার পানি দিয়ে ইঞ্জিন ধোয়ার সময় ইলেকট্রিক সেন্সরগুলোর ব্যাপারে সতর্ক থাকুন।

শেষ কথাঃ এক কথায় নিজের স্বাস্থ্যের দিকে যেভাবে আমরা খেয়াল করি একটু ভালো থাকার জন্য ঠিক গাড়ির ইঞ্জিনকে দীর্ঘদিন ভালো রাখার জন্য গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সম্পর্কে জানা উচিত। সে সাথে বিভিন্ন যন্ত্রাংশের যে রক্ষণাবেক্ষণ রয়েছে তার সঠিকভাবে অবশ্যই পালন করা উচিত।

গাড়ির ইঞ্জিন ভালো থাকলে দীর্ঘদিন ভালো সার্ভিস দেবে সেই সাথে অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনা থেকে কিছুটা হল রেয়াই পাওয়া যাবে। নিচের গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে কিছু টিপস দেয়া হলো জেনে নিন অবশ্যই কাজে লাগবে।

সঠিক ফুয়েল ব্যবহার: ভেজালমুক্ত জ্বালানি ইঞ্জিনের নকিং কমায়।

 সকালবেলা ওয়ার্ম-আপ: সকালে গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার পর অন্তত ১-২ মিনিট আইডল অবস্থায় রাখুন, যাতে তেল পুরো ইঞ্জিনে ছড়িয়ে পড়ে।

অপ্রয়োজনীয় লোড কমান: গাড়িতে অতিরিক্ত ওজন ইঞ্জিনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

পূর্বের পোস্ট পরবর্তী পোস্ট
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি
আপনার মতামত দিন
comment url